No icon

যে কারণে ছাত্রলীগ থেকে বাদ পড়লেন বরুড়ার রাকিব

নিজস্ব প্রতিবেদক। বরুড়ার রাকিব উদ্দিনসহ ছাত্রলীগের ৩২ নেতাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। অব্যাহতি পাওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরে যুক্ত থাকা, বিবাহিত হওয়া এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকাসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ছিল।

অব্যাহতি পাওয়াদের একজন কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার রাকিব উদ্দিন। সে সহ-সভাপতি পদে ছিলো। একটি বিশেষ সংস্থার রিপোর্টে তার বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ওঠে এসেছে।
রাকিবের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগসমূহ;
১। বিএনপি পরিবারের সদস্য: ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম ও ফাজিল পাশ করা রাকিব পারিবারিকভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ঝলম ইউনিয়নের শশইয়া গ্রামের আবদুল মান্নানের ছেলে রাকিব উদ্দিন। রাকিবের বাবা আবদুল মান্নান গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেম্বার পদে নির্বাচন করেছেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী তাবারুক হোসেনের কাছে ৬৩ ভোট পেয়ে হেরে যান।

২। পেশাদার ঠিকাদার: রাকিব পেশাদার ঠিকাদার। গ্রাম বাংলা কনস্ট্রাকশন লি: নামের একটি ঠিকাদারি কোম্পানীর মালিক রাকিব উদ্দিন। যার নামে রাজধানীর ধানমন্ডিতে একটি বহুতল ভবনের পাইলিংয়ের কাজ করেছেন তিনি। তার নামে ওয়ার্ক অর্ডার ও বিলের কাগজ পাওয়া গেছে।

৩। বিবাহিত: রাকিব উদ্দিন বিবাহিত। তার স্ত্রীর নাম তানিয়া আক্তার। তাকে বিয়ে করে লালবাগের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। ছাত্রলীগের নেতারা তাকে একাধিকবার ওই মেয়েসহ দেখছেন বলেও জানিয়েছেন।

৪। শিবির সংশ্লিষ্টতার দায়ে বহিষ্কৃত: ঢাকা আলিয়ার ছাত্র রাকিব মাদ্রাসার আল্লামা কাশগরী হলে থাকার সময় ২০১৪ সালে শিবির সংশ্লিষ্টতা ও তাদের হয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ মারামারির দায়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। তৎকালিন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি আনিসুর রহমান সরকার ও সাধারণ সম্পাদক আনিসুজ্জামান রানা তার বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

৫। চাঁদাবাজি: রাকিব উদ্দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আড্ডা দেন। আশাপাশেসহ রাজধানীর বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির কাছ থেকে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি করেন। এ কাজের তাকে সহায়তা করেন অর্ধডজন সহযোগী।

৬। ভুয়া ঢাবির পরিচয়: ঢাকা আলিয়ার ছাত্র হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়দানকারী রাকিব উদ্দিনের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সে ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ধ্যাকালিন এমবিএ কোর্সের টুরিজম ও হসপিটালিটি বিষয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। এরপর আর তিনি এটি শেষ করতে পারেননি। বরং এই বিভাগে ভর্তি করিয়ে দেবে প্রলোভন দিয়ে নানা জনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার‌্য স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২১জন ছাত্রনেতাকে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের অব্যাহতি (বহিষ্কার) দিয়ে পদগুলো শূণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। আরও ১১জনকে তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে অব্যাহতি (ছাড়পত্র) দিয়ে পদগুলো শূণ্য ঘোষনা করা হয়েছে।

অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ সাপেক্ষে পাওয়ায় ২১ জন অব্যাহতি

অভিযুক্ত ২১ জন হলেন— সহসভাপতি তানজিল ভূঁইয়া তানভির, আরেফিন সিদ্দিক সুজন, আতিকুর রহমান খান, বরকত হোসেন হাওলাদার, শাহরিয়ার কবির বিদ্যুৎ, সাদিক খান, সোহানী হাসান তিথী, মুনমুন নাহার বৈশাখী, আবু সাঈদ (সাস্ট), রুহুল আমিন, রাকিব উদ্দিন, সোহেল রানা ও ইসমাইল হোসেন তপু; দফতর সম্পাদক আহসান হাবীব; ধর্ম সম্পাদক তাজ উদ্দীন; উপদফতর সম্পাদক মমিন শাহরিয়ার ও মাহমুদ আব্দুল্লাহ বিন মুন্সী; উপসাংস্কৃতিক সম্পাদক বি এম লিপি আক্তার ও আফরিন লাবনী এবং সহসম্পাদক সামিয়া সরকার ও রনি চৌধুরী।

সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, অব্যাহতি (বাদ) পাওয়া এ ২১জন তাদের নামের সঙ্গে সাবেক হিসেবেও এ পদ ব্যবহার করতে পারবেন না। কারণ তাদের কাছ থেকে পদ ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং এ পদে আরেকজনকে দায়িত্ব দেয়া হবে।

নিজ আবেদনের প্রেক্ষিতে ১১ নেতাকে অব্যাহতি

এছাড়াও নিজে আবেদন করে অব্যাহতি নিয়েছেন ১১ জন। এরা হলেন— সহসভাপতি এস এম তৌফিকুল হাসান সাগর, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, বি এম শাহরিয়ার হাসান, হাফিজুর রহমান ও এস এম হাসান আতিক; স্বাস্থ্য সম্পাদক শাহরিয়ার ফেরদৌস; উপস্বাস্থ্য সম্পাদক রাতুল সিকদার ও শাফিউল সজিব; উপপ্রচার সম্পাদক সিজান আরেফিন শাওন; উপপাঠাগার সম্পাদক রুশী চৌধুরী এবং সহসম্পাদক আঞ্জুমানারা অনু।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর আড়াই মাস পর ৩১ জুলাই রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করা হয়। পরে চলতি বছরের ১৩ মে ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন শোভন-রাব্বানী। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ছাত্রদল-জামায়াত শিবির ও ব্যবসায়ী, বিবাহিতদের পদ দেওয়া হয়েছে অভিযোগ তুলে পদবঞ্চিতরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিল শেষে তারা সন্ধ্যায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে পদপ্রাপ্ত কিছু নেতাকর্মী ও তাদের সমর্থকরা পদবঞ্চিতদের ওপর হামলা চালায়। পরে পদবঞ্চিতরা আন্দোলন শুরু করেন এবং ৯৯ জনের একটি তালিকাও প্রকাশ করেন। পদবঞ্চিতদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৫ মে মধ্যরাতে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী জানান, নতুন কমিটির ১৭ জন ‘বিতর্কিত’ বলে অভিযোগ পেয়েছেন তারা। পরে ২৯ মে ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির ১৯টি পদ শূন্য ঘোষণা করে ছাত্রলীগ।

এদিকে, হামলার শিকার পদবঞ্চিতদের সঙ্গে ১৯ মে রাতেই আলোচনায় বসেন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। সেদিন মধ্যরাতে তাদের ওপর গোলাম রাব্বানীর অনুসারীরা ফের হামলা করেন বলে অভিয়োগ তুলে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে প্রথমে তারা দাবি আদায়ে অনশনে বসেন। পরে শুধু অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এমনকি ঈদও তারা টিএসসিতে পালন করেন।

এদিকে, চাঁদাবাজিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাদের পরিবর্তে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকেই তাদের ওপর চাপ ছিল অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। অবশেষে ছাত্রলীগের অভিভাবক আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শক্রমে ৩২ কেন্দ্রীয় নেতাকে পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো।

Comment As:

Comment (0)